সিংহাসন হারানো সম্রাট আর এক অমর প্রেমের শেষ প্রহর

All the latest news from the world of art and design​

 

মুঘল ইতিহাসের পাতায় সম্রাট শাহজাহানের নামটা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকলেও, তাঁর জীবনের শেষ আটটি বছরের গল্পটা বড়ই করুণ। যে সম্রাট একদিন দিল্লির ময়ূর সিংহাসনে বসে দোর্দণ্ড প্রতাপে সাম্রাজ্য শাসন করেছেন, যাঁর ইশারায় তাজমহলের মতো স্থাপত্য দাঁড়িয়েছে ভাবলে অবাক লাগে, সেই মানুষটার শেষ নিঃশ্বাস পড়েছিল আগ্রা দুর্গের এক নির্জন বন্দিশালায়। ক্ষমতার চূড়া থেকে এক লহমায় ধুলোয় আছড়ে পড়ার এমন ট্র্যাজেডি ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়।

১৬৫৮ সালের সেই রক্তক্ষয়ী উত্তরাধিকার যুদ্ধের কথা আমরা জানি। নিজের চার সন্তানের লড়াই চোখের সামনে দেখতে হয়েছিল বৃদ্ধ সম্রাটকে। আদরের বড় ছেলে দারা শিকোহ্ ছিলেন সম্রাটের চোখের মণি, কিন্তু তলোয়ার আর রাজনীতির চালে জিতে গেলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী আওরঙ্গজেব। সামুগড়ের যুদ্ধে পরাজয়ের পর আওরঙ্গজেব যখন আগ্রা দুর্গ ঘেরাও করলেন, তখন প্রথম আঘাতটা হানলেন দুর্গের জল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে। তেষ্টায় কাতর বৃদ্ধ বাবা ক্ষোভ আর অভিমানে তখন বলেছিলেন, “হিন্দুরা তাদের মৃত পূর্বপুরুষদেরও জল দেয়, আর আমি এই দুর্ভাগা পিতা বেঁচে থাকতেও নিজের ছেলের হাতে এক আঁজলা জল পাচ্ছি না।” এরপর দারা শিকোহ্‌র নির্মম মৃত্যু আর তাঁর কাটা মুণ্ডু দেখে সম্রাট মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েন।

আওরঙ্গজেব তাঁকে বন্দি করে রাখলেন ‘মুসাম্মান বুর্জ’ এ। সেখান থেকে যমুনার ওপাড়ে ঝাপসা চোখে তাজমহল দেখা যেত। সেই বন্দিদশা ছিল এক চূড়ান্ত নিঃসঙ্গতার নামান্তর। সম্রাটকে বাইরের জগৎ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি তিনি যেন কাউকে চিঠি লিখতে না পারেন, সেজন্য কেড়ে নেওয়া হয়েছিল তাঁর কলম আর কাগজ। তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও প্রদীপের মতো পাশে ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা জাহানারা। রাজকীয় আয়েশ বিসর্জন দিয়ে তিনি বৃদ্ধ বাবার ছায়াসঙ্গী হয়ে রইলেন।

শেষ বয়সে শাহজাহানের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বারান্দায় বসে তিনি অপলক তাকিয়ে থাকতেন মমতাজের সেই স্মৃতিসৌধের দিকে। লোকমুখে শোনা যায়, সরাসরি তাকাতে কষ্ট হলে তিনি দেওয়ালের খোদাই করা স্ফটিকের প্রতিফলনে তাজমহল দেখতেন। কোটি টাকার হীরে-জহরত যাঁর পায়ের কাছে গড়াগড়ি খেত, জীবনের শেষে এসে ওই এক টুকরো পাথরই যেন ছিল তাঁর জগতের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।

১৬৬৬ সালের ২২ জানুয়ারি। আগ্রার হাড়কাঁপানো এক শীতের সকালে ফুরিয়ে এল সম্রাটের দিনকাল। মৃত্যুর আগে তিনি শান্ত ছিলেন; কানে বাজছিল পবিত্র কোরআনের তিলাওয়াত আর চোখের সামনে ছিল সেই প্রিয় তাজমহল। শাহজাহান বিদায় নিলেন, কিন্তু সেই বিদায়টা ছিল ভীষণ অনাড়ম্বর। আওরঙ্গজেব তখন আগ্রার বাইরে। কোনো রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হলো না, বাজল না কোনো শোকাতুর নহবত। সাধারণ কয়েকজন ভৃত্য আর খোজা প্রহরীদের কাঁধে চড়ে দিল্লির বাদশাহর কফিন দুর্গ থেকে বের হলো। জাহানারার অনেক ইচ্ছে থাকলেও শেষযাত্রা জাঁকজমকপূর্ণ করা সম্ভব হয়নি।

অবশেষে সাধারণ মানুষের মতোই তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো তাজমহলে। মমতাজের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তিনি। ময়ূর সিংহাসন, কোহিনূর কিংবা বিশাল তখ্ত সব তো রয়ে গেল ওখানেই। কেবল রয়ে গেল এক অমর প্রেমকাহিনি। আজও তাজমহলের সেই গম্বুজের নিচে পাশাপাশি দুটি কবর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতা আর প্রতাপ সময়ের স্রোতে ভেসে যায়, কিন্তু শিল্পের তুলিতে আঁকা ভালোবাসা অমর হয়ে থাকে।

Related Post