পাকিস্তান আফগানিস্তান সংকট: তালেবান বিভক্তির নেপথ্য কথা

All the latest news from the world of art and design​
পাকিস্তানে আত্মঘাতী বোমা হামলা বর্তমানে এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ২০২৫ সাল দেশটির জন্য একটি অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী বছর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে,যা গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা। পাকিস্তান বলছে, এই সহিংসতার জন্য যারা দায়ী, তাদের পেছনে আফগান তালেবান সরকারের সমর্থন রয়েছে। তারা এখন আফগান তালেবানদের পুরোপুরি অবিস্বাস্য বলে মনে করছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান এখন নিজেদের মধ্যে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছে,বিশেষ করে সীমান্ত অঞ্চলে। সেখানে কোনো যুদ্ধবিরতিই টিকছে না।
অথচ এক সময় পাকিস্তান তার প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তানকে নিয়ে অনেক উচ্চাশা পোষণ করত। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, আফগান তালেবানরা পাকিস্তানের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে। এমতাবস্থায় প্রশ্ন জাগে, এই সহিংসতা কি পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে? আর এই হামলাগুলোর পেছনে আসলে কী রয়েছে?
এর উত্তর খুঁজতে আমাদের শুরু করতে হবে পাকিস্তানের ‘দারুল উলুম হাক্কানিয়া’ মাদরাসা থেকে। এটি একটি ইসলামি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। মাঝে মাঝে একে “জিহাদের বিশ্ববিদ্যালয়” বলেও ডাকা হয়। আফগানিস্তানের বর্তমান ক্ষমতায় থাকা অনেক উচ্চপদস্থ তালেবান নেতা এই মাদরাসায় পড়াশোনা করেছেন। আপনি হয়তো ভাবছেন এই সেমিনারি বা মাদরাসাটি আফগানিস্তানে অবস্থিত, তাই না? আসলে তা নয়। এটি পাকিস্তানে অবস্থিত, যা আফগান সীমান্ত থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে। বিশ্বাস করা হয় যে, তালেবান আন্দোলনের জন্ম হয়েছে এই ধরণের ধর্মীয় সেমিনারি এবং মূলত এই সীমান্ত অঞ্চল থেকেই।
এখানে আমাদের ইতিহাসের দিকে একটু নজর দিতে হবে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান আক্রমণ ও দখল করেছিল। তখন ইসলামকে কেন্দ্র করে একটি প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে। মূলত সোভিয়েত দখলদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করা মুজাহিদিন যোদ্ধাদের মধ্য থেকেই তালেবানের জন্ম। আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, তালেবান আসলে শুরুর দিন থেকেই একটি পাকিস্তানি প্রজেক্ট ছিল। পাকিস্তান একটি মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেই সময়ে যা পরে তালেবানে রূপান্তরিত হবে তার পেছনে প্রচুর অর্থ ঢেলেছিল। পাকিস্তানের শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইএর পাশাপাশি সৌদি আরব এবং আমেরিকাও তখন তাদের সমর্থন দিয়েছিল, কারণ তারা সবাই মিলে কমিউনিজমকে পরাজিত করতে চেয়েছিল।
সোভিয়েতরা চলে যাওয়ার পর আফগানিস্তানে দীর্ঘ বছরের গৃহযুদ্ধ চলে। ১৯৯৬ সালে তালেবান আন্দোলন সফলভাবে কাবুল দখল করে। উল্লেখ্য যে, পাকিস্তান ছিল সেই সময়ের হাতেগোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি যারা তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০১ সালে মার্কিন আক্রমণের মাধ্যমে এই তালেবান শাসন ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং শুরু হয় এক দীর্ঘ যুদ্ধ। যার ফলশ্রুতিতে বিশ বছর পর তালেবানরা আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসে। আবারও পাকিস্তান তালেবান শাসনকে স্বাগত জানায়। তাহলে প্রশ্ন হলো, এত গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং সাধারণ আদর্শিক ভিত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন পাকিস্তান এবং আফগান তালেবানের মধ্যে এখন লড়াই চলছে?
এটি বুঝতে হলে আমাদের পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার সীমান্তের দিকে নজর দিতে হবে। এই সীমান্তটি ঐতিহাসিকভাবে পশতুন অধ্যুষিত একটি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। পশতুনরা একটি বড় জাতিগোষ্ঠী যারা তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য পরিচিত। এই অঞ্চলটি সর্বদা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সীমান্ত দিয়ে অবাধে বাণিজ্য চলত এবং একটি প্রধান ক্রসিংয়ে একটি “ফ্রেন্ডশিপ গেট” বা মৈত্রী তোরণও তৈরি করা হয়েছিল। এখানকার বন্ধন কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি পারিবারিক এবং উপজাতীয়ও বটে।
পাকিস্তানের পেশোয়ারের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক মিনহাস মাজিদ খানের মতে, এই সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসের অর্থ হলো মানুষের ক্রমাগত চলাচলের অভিজ্ঞতা অর্জন করা। তবে সীমান্ত দিয়ে কেবল পণ্য বা পরিবারই পার হয় না,জঙ্গিরাও পার হয়। পেশোয়ারে বসবাসকারী মানুষজন সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন যেখানে তারা সীমান্ত পার হয়ে আসা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। এই সন্ত্রাসীরা সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশে থাকে এবং আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে।
এই অঞ্চলের ভূগোল মূলত পাহাড়ি, যার মানে হলো পাকিস্তান সরকারের পক্ষে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন। তা সত্ত্বেও পাকিস্তান কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে এবং সীমান্ত চৌকি স্থাপন করে এলাকাটি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। কিন্তু আফগান তালেবানরা এই কাজে বাধা দিচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এর কারণ হলো তারা এই সীমান্তকে বৈধ বলে স্বীকারই করে না। আসলে এই সীমান্তটি ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সময় ব্রিটিশ কূটনীতিক হেনরি মর্টিমার ডুরান্ডের মাধ্যমে অঙ্কিত হয়েছিল, যখন বর্তমান পাকিস্তান ব্রিটিশ ভারতের অংশ ছিল। এটি আজও ‘ডুরান্ড লাইন’ নামে পরিচিত। যেহেতু এটি সরাসরি পশতুন অঞ্চলের মাঝখান দিয়ে আঁকা হয়েছিল, তাই আফগানিস্তান সর্বদা এটিকে একটি অন্যায্য এবং অবৈধ চুক্তি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। বর্তমান আফগান তালেবান সরকারসহ কোনো আফগান সরকারই এই সীমান্তকে স্বীকৃতি দেয়নি, যদিও আন্তর্জাতিকভাবে এটি স্বীকৃত। পাকিস্তান এই সীমান্তকে স্বীকার করে।
এই সীমান্ত ইস্যুটি দুই দেশের মধ্যে এমন গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে যে, দুই পক্ষের পক্ষে এক টেবিলে বসা বা একে অপরকে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এটিই বর্তমান লড়াইয়ের প্রধান কারণ। তবে পাকিস্তানের দুশ্চিন্তার বড় কারণ হলো “অন্য এক তালেবান”। হ্যা, আরেকটি তালেবান গোষ্ঠী রয়েছে। আমরা এতক্ষণ আফগান তালেবানদের কথা বলছিলাম যারা কাবুলের ক্ষমতায় আছে। কিন্তু ‘তেহরিকইতালেবান পাকিস্তান’ বা টিটিপি (TTP) নামে আরেকটি গোষ্ঠী আছে যারা মূলত পাকিস্তানি তালেবান। টিটিপি গঠিত হয়েছিল পাকিস্তানের দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলে, যা আগে ফাটা (FATA) নামে পরিচিত ছিল। টিটিপি চায় এই এলাকাটি আধাস্বায়ত্তশাসিত হোক এবং সেখানে কঠোর ইসলামি শাসন চলুক। এটিই তাদের লড়াইয়ের মূল উদ্দেশ্য।
২০২৫ সালে পাকিস্তানে হওয়া অধিকাংশ নৃশংস হামলার দায় এই টিটিপি স্বীকার করেছে। তাদের ইতিহাস অত্যন্ত ভয়ানক। ২০১৪ সালে পেশোয়ারের আর্মি স্কুলে হামলা চালিয়ে তারা ১৩০টিরও বেশি শিশুকে হত্যা করেছিল। এমনকি নোবেল বিজয়ী মালালা ইউসুফজাইকেও তারা লক্ষ্যবস্তু করেছিল। বর্তমানে টিটিপির অধিকাংশ হামলা হচ্ছে পাকিস্তানি সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর। দুর্গম পাহাড়ের কারণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে এদের পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন হয়ে পড়ছে। মূলত টিটিপি চায় লড়াইয়ের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দিতে।
কাবুলের আফগান তালেবান এবং পাকিস্তানের টিটিপির মধ্যে সম্পর্ক অনেক পুরনো। যদিও তারা আলাদা সংগঠন, কিন্তু আদর্শিকভাবে তারা একই। উভয় গোষ্ঠীই শরিয়াহ শাসন চায়। আফগান তালেবানদের অধীনে এর অর্থ দাঁড়িয়েছে নারীদের জনজীবন থেকে বাদ দেওয়া এবং মেয়েদের শিক্ষা নিষিদ্ধ করা। অনেক টিটিপি সদস্য আগে আফগান তালেবানদের হয়ে লড়াই করেছেন। তারা দীর্ঘকাল ধরে একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ২০০১ সালে যখন আমেরিকা আফগানিস্তানে আক্রমণ করে, তখন আফগান তালেবানরা সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানের ফাটা অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিল। আবার ২০১৪ সালে যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী টিটিপির বিরুদ্ধে অভিযান চালায়, তখন তারা আফগানিস্তানে আশ্রয় নেয়। পাকিস্তান বলছে, টিটিপি এখনো আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে এবং আফগান তালেবানরা তাদের মদদ দিচ্ছে। যদিও আফগান তালেবানরা তা অস্বীকার করছে।
পাকিস্তান আশা করেছিল ২০২১ সালে তালেবানরা কাবুল দখল করলে তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি কমবে। কিন্তু এখন পাকিস্তানের সেই উৎসাহ আর নেই। তারা বুঝতে পেরেছে যে তালেবানরা এখন আর পাকিস্তানের ওপর নির্ভরশীল নয়, কারণ তাদের আর কোনো নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন নেই। ফলে পাকিস্তান তাদের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এর মধ্যে আরও একটি চমকপ্রদ বিষয় হলো, আফগান তালেবানরা এখন ভারতের দিকে ঝুঁকছে। আফগান তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি ভারত সফর করেছেন এবং সেখানে একটি ইসলামি মাদরাসাও পরিদর্শন করেছেন। ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকারের সঙ্গে এই ইসলামি শাসনের ঘনিষ্ঠতা পাকিস্তানকে সব দিক থেকে চাপে ফেলে দিয়েছে। পূর্বে ভারত এবং পশ্চিমে আফগান তালেবানের সঙ্গে সংঘাত পাকিস্তানকে এক সংকটময় অবস্থায় ফেলেছে।
এই অস্থিরতা কেবল পাকিস্তান নয়, চীনকেও ভাবিয়ে তুলছে। পাকিস্তানে চীনের অনেক বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প রয়েছে। সম্প্রতি টিটিপির হামলায় ৫ জন চীনা প্রকৌশলী নিহত হয়েছেন। চীন দুই দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখতে চায় কারণ তারা আফগানিস্তানেও বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। কিন্তু এই সীমান্ত সংঘাত চীনের পরিকল্পনাকেও বাধাগ্রস্ত করছে। যদিও বিভিন্ন মুসলিম দেশ এই সংঘাত থামাতে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে, কিন্তু সীমান্তের ডুরান্ড লাইন এবং জঙ্গি দমনের মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে কোনো ঐক্যমত না হওয়ায় শান্তি অধরাই থেকে যাচ্ছে।

Related Post