বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিনের সম্পর্কের ইতিহাস গতানুগতিক কোনো কূটনৈতিক লেনদেন নয়, বরং দুটি জাতির অভিন্ন আবেগ, সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের এক অবিচ্ছেদ্য মহাকাব্য।
মানচিত্রের দূরত্ব ছাপিয়ে এই দীর্ঘস্থায়ী বন্ধন গড়ে উঠেছে আদর্শিক সংহতি আর শোষিতের পক্ষে দাঁড়ানোর অদম্য স্পৃহা থেকে। দক্ষিণ এশিয়ার একটি বদ্বীপ আর মধ্যপ্রাচ্যের রক্তস্নাত জনপদ কীভাবে একসূত্রে গেঁথে গেল, তা বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ইতিহাসের সেই সোনালী অধ্যায়গুলোতে, যেখানে বাংলার আকাশ আর ফিলিস্তিনের বাতাস একাত্ম হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশের জন্মের লগ্ন থেকেই এই সম্পর্কের বীজ বপন হয়েছিল, যা সময়ের সাথে সাথে একটি বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। আজ যখন আমরা ফিলিস্তিনের দুর্দশা দেখি, তখন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে যে হাহাকার তৈরি হয়, তার পেছনে রয়েছে অর্ধশতাব্দীর এক গভীর রাজনৈতিক,মানবিক ও সংগ্রামী উত্তরাধিকার।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিল, ঠিক সেই কঠিন সময়ে ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থা বা পিএলও এবং তাদের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাত বাঙালির এই সংগ্রামকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন। সে সময় বৈশ্বিক রাজনীতি ছিল অত্যন্ত জটিল এবং আরব বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী দেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে দোটানায় ছিল। কিন্তু ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব দ্বিধাহীনভাবে ঘোষণা করেছিল যে, বাঙালির মুক্তি লড়াই হলো একটি নিপীড়িত জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের সংগ্রাম। ফিলিস্তিনিদের এই নৈতিক অবস্থান তৎকালীন বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য ছিল এক বিশাল মানসিক শক্তি। যদিও ফিলিস্তিন তখন নিজেই নিজের স্বাধীনতার জন্য লড়ছিল, তবুও অন্যের দুঃখকে অনুভব করার সেই বিরল দৃষ্টান্তই আজ অবধি বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিনের মধ্যে এক অলিখিত ভ্রাতৃত্বের দেয়াল তৈরি করে রেখেছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে এই সম্পর্কের ভিত আরও মজবুত করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে ফিলিস্তিন ইস্যুটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। বঙ্গবন্ধু সবসময় শোষিতের পক্ষে কথা বলতেন, আর তাই ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় তিনি ফিলিস্তিনিদের প্রতি কেবল মৌখিক সমর্থন দিয়েই ক্ষান্ত হননি। নবগঠিত ও সম্পদহীন একটি দেশের শাসক হয়েও তিনি সেই যুদ্ধে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। বাংলাদেশ থেকে একদল দক্ষ চিকিৎসক এবং বিপুল পরিমাণ চা পাঠানো হয়েছিল ফিলিস্তিনি ও আরব ভাইদের জন্য, যা ছিল সংহতির এক অভূতপূর্ব নজির। ১৯৭৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে ইয়াসির আরাফাতের সাথে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক কোলাকুলি কেবল দুই নেতার মিলন ছিল না, তা ছিল দুটি মুক্তিকামী আত্মার মিলন। বঙ্গবন্ধুর ঐকান্তিক চেষ্টায় বাংলাদেশ পিএলও-কে ফিলিস্তিন জনগণের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং ঢাকায় তাদের পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক দপ্তর খোলার অনুমতি প্রদান করে। বঙ্গবন্ধু বিশ্বমঞ্চে বারবার ঘোষণা করেছিলেন যে, ফিলিস্তিনিদের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই শান্তি সম্ভব নয়।
পরবর্তীতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় এই সম্পর্ক আলোচনার টেবিল থেকে বেরিয়ে সরাসরি রণক্ষেত্রে সংহতির রূপ নেয়। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের সামরিক ও কৌশলগত সমর্থন ফিলিস্তিনের জন্য ছিল এক অনন্য পাওয়া। সেই সময়কার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং গর্বিত ইতিহাস হলো বাংলাদেশের প্রায় ৮ হাজার তরুণ যুবকের ফিলিস্তিনের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ।

আশির দশকের শুরুতে যখন লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন চরমে, তখন এই স্বেচ্ছাসেবক যোদ্ধারা বাংলাদেশ থেকে পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর মধ্যপ্রাচ্যে। তারা পাকিস্তান,ব্যাংকক,দুবাই হয়ে সিরিয়া জান এবং ইয়াসির আরাফাতের কমান্ডে পিএলও এর পতাকাতলে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে লড়েছিলেন। এমনকি হিন্দু সম্প্রদায় থেকেও বীরেরা এই যুদ্ধ যাত্রায় অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশী যোদ্ধারা একসময় বন্দী ছিলেন ইসরায়েল এর ডিটেনশন ক্যাম্পে, সহ্য করেছিলেন অবর্ণনীয় শাস্তি। বাংলাদেশের তরুণদের এই ফিলিস্তিন যাত্রার অন্যতম নায়ক এবং সংগঠক ছিলেন বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সেনানি মেজর জলিল এবং কর্নেল তাহের। এই বীরত্বগাথা আজও ফিলিস্তিনিদের মুখে মুখে ফেরে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঐতিহাসিক দলিলে “বাংলাদেশি ভলান্টিয়ার্স” হিসেবে তাদের আত্মত্যাগ স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক ফোরামে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে অত্যন্ত সোচ্চার ছিলেন। ১৯৮১ সালে তার মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর যখন ফিলিস্তিনে পৌঁছায়, তখন সেখানে শোকের ছায়া নেমে আসে। ইয়াসির আরাফাত নিজে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন এবং পিএলও আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় শোক পালন করেছিল। তারা মনে করেছিল, ফিলিস্তিন তার সবচেয়ে সাহসী এক অভিভাবককে হারিয়েছে।
পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এই কূটনৈতিক ধারাবাহিকতাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি ফিলিস্তিনের স্বার্থ রক্ষায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। খালেদা জিয়ার শাসনামলে জাতিসংঘ, ওআইসি এবং জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) প্রতিটি সম্মেলনে ফিলিস্তিন ইস্যুকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হতো। তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে অত্যন্ত জোরালোভাবে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরতেন। তার সময়েই ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দরজা আরও উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। বিশেষ করে চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে আসা শত শত ফিলিস্তিনি তরুণ আজও বাংলাদেশের আতিথেয়তার গল্প করেন। ২০০৬ সালে যখন গাজায় ইসরায়েলি হামলা তীব্রতর হয়, তখন খালেদা জিয়ার সরকার জাতীয়ভাবে শোক দিবস ঘোষণা করে বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, ফিলিস্তিনের প্রতিটি ক্ষত বাংলাদেশের গায়েও লাগে। তিনি বারবার স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, বাংলাদেশ কোনোদিন ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না এবং ফিলিস্তিনিদের মুক্তিকামী অবস্থানের পাশে হিমালয়ের মতো অটল থাকবে।

বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিনের এই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা প্রমাণ করে যে, ন্যায়বিচারের লড়াইয়ে কোনো ভৌগোলিক সীমানা বাধা হতে পারে না। সত্তরের দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতিটি সরকার এবং সাধারণ মানুষ ফিলিস্তিনের অধিকার আদায়ে যে অবিচল সমর্থন দিয়ে আসছে, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে আশি ও নব্বইয়ের দশকের সেই উত্তাল দিনগুলোতে বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিন একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে। ৮ হাজার তরুণের সেই অসীম সাহসিকতা কিংবা আন্তর্জাতিক মঞ্চে আমাদের রাষ্ট্রনায়কদের অনড় অবস্থান, সবই ছিল এক বৃহত্তর মানবিক দায়বদ্ধতার অংশ। আজ যখন আমরা পেছন ফিরে তাকাই, তখন গর্বের সাথে বলতে পারি, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার মিছিলে বাংলাদেশের পতাকা সবসময় সমুন্নত ছিল এবং থাকবে। এই সম্পর্ক কেবল রাজনীতির নয়, এটি হৃদয়ের; যা সময়ের আবর্তে আরও দৃঢ় হবে এবং আগামী প্রজন্মকেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।