সুদান: সোনা নয়, ভূমি যেখানে মুখ্য

All the latest news from the world of art and design​

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ থেকে প্রায় বারো থেকে তেরো গুণ বড় সুদান আফ্রিকার এক বিশাল দেশ, যার প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য তাকে একই সঙ্গে আশীর্বাদ ও অভিশাপ দুটোই দিয়েছে। সুবিশাল এই ভূমি শুধু আফ্রিকার নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। নীলনদের দুই তীরজুড়ে বিস্তৃত উর্বর কৃষিজমি, সোনার খনি, তেল ও লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথ সব মিলিয়ে সুদান এমন এক দেশ, যেখানে ভূ-প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার আগুনও সমানভাবে জ্বলছে। এই আগুনের কেন্দ্রে এখন রয়েছে আরব আমিরাত, যার আগ্রহ শুধু সুদানের স্বর্ণভাণ্ডারে নয়, বরং তার কৃষি ও জলসম্পদে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আরব উপদ্বীপে কৃষি উৎপাদন ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। মরুভূমিতে সীমিত পানি ও অল্প আবাদযোগ্য জমি নিয়ে ইউএই এক সংকটময় অবস্থায় রয়েছে। দেশটির প্রায় নব্বই শতাংশ খাদ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই সংকট মোকাবিলায় ইউএই সরকার সুদানের উর্বর জমিকে বেছে নিয়েছে এক কৌশলগত খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে। তবে এই পরিকল্পনা কেবল কৃষি উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রকল্প যেখানে খাদ্যনিরাপত্তা, বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, এমনকি সামরিক প্রভাবও একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ইউএই-সমর্থিত ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিং কোম্পানি ও জেনান ইনভেস্টমেন্টের মতো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে সুদানে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে আবু হামাদ কৃষি প্রকল্পের জন্য প্রাথমিক ছয় বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই অর্থ শুধু আবাদি জমি উন্নয়নের জন্যই নয়, বরং আবু আমামা বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাব নির্মাণেও ব্যয় হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই সুদানে উৎপন্ন খাদ্যশস্য সরাসরি ইউএই-এর বাজারে পৌঁছে দেওয়া। বর্তমানে ইউএই-এর হাতে সুদানে প্রায় পঞ্চাশ হাজার হেক্টরেরও বেশি কৃষিজমি রয়েছে, এবং নতুন চুক্তির মাধ্যমে আরও এক লক্ষ বাষট্টি হাজার হেক্টর জমি যোগ হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ মোট দুই লক্ষ বারো হাজার হেক্টরেরও বেশি উর্বর ভূমি এখন ইউএই-এর নিয়ন্ত্রণে।

তবে এই বিশাল কৃষি উদ্যোগের অন্তরালে লুকিয়ে আছে আরেকটি কৌশল “ল্যান্ড ব্যাংকিং”। যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানে সরাসরি উৎপাদন ঝুঁকিপূর্ণ হলেও ইউএই জমিগুলোকে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করছে। যুদ্ধ শেষ হলে বা স্থিতিশীলতা ফিরে এলে এসব জমি দীর্ঘমেয়াদে তাদের খাদ্য সরবরাহ ও বাণিজ্য রুটের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করবে। এই ল্যান্ড ব্যাংকিং কৌশলই ইউএই-এর আসল সাফল্য। একে অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক “কৃষি কূটনীতি” বললেও, স্থানীয় সুদানীয়দের কাছে এটি প্রায়শই “সবুজ উপনিবেশবাদ” বা নব্য-ঔপনিবেশিকতা হিসেবে দেখা হয়। কারণ এসব প্রকল্পে সাধারণ কৃষকরা তাদের জমি হারাচ্ছেন, মজুরি পাচ্ছেন সামান্য, আর উৎপাদনের লাভ চলে যাচ্ছে বিদেশি কর্পোরেশনের হাতে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ইউএই এসব বিনিয়োগের পেছনে কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামরিক প্রভাবও কাজে লাগাচ্ছে। সুদানের আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফ বা র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের সঙ্গে ইউএই-এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, যা স্থানীয় সংঘাতকে আরও জটিল করেছে। আরএসএফ বাহিনী দেশজুড়ে স্বর্ণ ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে, এবং ইউএই-এর সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এই ক্ষমতার ভারসাম্যকে বিকৃত করছে। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হচ্ছে, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কিন্তু ইউএই তার জমি ও বন্দর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে নিঃশব্দে। এই প্রক্রিয়ায় অর্থনৈতিক বিনিয়োগ একধরনের ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে, যা সামরিক দখলের চেয়েও স্থায়ী ও কার্যকর।

সুদান নিয়ে ইউএই-এর আগ্রহ শুধু আফ্রিকার সীমায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি আফ্রিকায় আরব শক্তির পুনঃপ্রতিষ্ঠার অংশ। রাশিয়া, চীন, তুরস্ক ও সৌদি আরবও একইভাবে সুদানে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। কেউ নৌঘাঁটি চাইছে, কেউ কৃষি চুক্তি, কেউ বা বাণিজ্য করিডোরে আধিপত্য। এই প্রতিযোগিতা আফ্রিকার ভূখণ্ডকে এক নতুন ধরণের “ঠান্ডা যুদ্ধের” পরীক্ষাগারে পরিণত করেছে, যেখানে অস্ত্র নয়, বিনিয়োগই সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।

সুদানের বর্তমান অবস্থান ২১ শতকের নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে যুদ্ধের কারণ তেল বা সোনা নয়, বরং জমি, জল ও খাদ্যনিরাপত্তা। ইউএই-এর মতো দেশগুলো বুঝতে পেরেছে যে ভবিষ্যতের রাজনীতি ও ক্ষমতার লড়াই হবে খাদ্য ও পানির নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে। তাই আজ তারা আফ্রিকার মাটিতে কৃষি জমি কিনছে, নদী ঘিরে প্রকল্প গড়ছে, বন্দর তৈরি করছে সবই ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। কিন্তু এই কৌশল সুদানের জনগণের জন্য কতটা ন্যায্য বা টেকসই, সেই প্রশ্নের উত্তর আজও অমীমাংসিত। সুদানের মাটিতে হয়তো এখন বিনিয়োগের চাষ হচ্ছে, কিন্তু সেই ফসল কার পাতে উঠবে তা নির্ধারণ করবে আগামী দশকের আফ্রিকার ভবিষ্যৎ রাজনীতি।

Related Post